সোনালি মুরগির রোগ ও চিকিৎসা

যেকোন রোগই অনাকাংক্ষিত বিষয়। সোনালি মুরগি পালনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত রোগ সমুহ হতে পারে। বেশির ভাগ মারাত্নক রোগের জন্য টিকা বা ভ্যাকসিন আবিস্কার হয়েছে। তবে যথাযথ ব্যাবস্থা ও জৈব নিরাপত্তা মেনে চললে প্রায় সকল রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। সোনালি মুরগির রোগ ও চিকিৎসা এর বিষয় নিচে আলোকপাত করা হলো।

মুরগির রোগ প্রধানত তিন ধরনের হয়ে থাকে। যথাঃ

  • ভাইরাস জনিত
  • প্রোটোজোয়া জনিত
  • ও ব্যাক্টেরিয়া জনিত

নিচে এই তিন প্রকারের সংক্রামন সম্পর্কে সোনালি মুরগির রোগ ও চিকিৎসা বনর্না করা হলো।

সোনালি মুরগির ভাইরাস জনিত রোগ

মুরগির ভাইরাস জনিত রোগের জন্য ভ্যাক্সিন বা টিকা প্রাদান করাই প্রতিরোধের একমাত্র উপায়। নিয়মিত ভ্যাকসিন প্রদান করলে মুরগির ভাইরাস জনিত রগ থেকে মুক্ত থাকা যায়।

রানিক্ষেত রোগ

রানিক্ষেত একটি ভাইরাস জনিত মারাত্মক সংক্রামক রোগ। যা মূলত, ‘নিউক্যাসল ডিজিজ ভাইরাস‘ (এনডিভি) দ্বারা সংক্রমিত হয়। এটি প্রাথমিকভাবে তীব্র শ্বাসযন্ত্রের রোগ হিসাবে দেখা দেয়। তবে ঝিমানো, দুর্বলতা বা স্নায়বিক প্রকাশ এবং ডায়রিয়ার মত লক্ষনসমূহ দেখা যেতে পারে। এর ফলে ১০০% পর্যন্ত মৃত্যু হতে পারে। যে কোন বয়সের সোনালি মুরগির এই রোগ হতে পারে।

ভ্যাকসিন এর মাধ্যমে এই রোগের প্রতিরোধ সম্ভব।

মুরগির রানীক্ষেত রোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কে আরো জানতে আমাদের এই লেখাটি পড়ুন।

সোনালি মুরগি

গামবোরো রোগ

গামবোরো একটি ভাইরাস জনিত রোগ। এটি মুরগির লসিকা গ্রন্থি বারসাকে আক্রান্ত করে। একে ‘ইনফেকসাস বারসাল ডিজিজ’ বলা হয়। গামবোরো হলে মুরগির রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আক্রান্ত হয়। এ রোগে মৃত্যুর হার প্রায় ৩০%। সাধারণত ১০-৫০ দিন বয়স পর্যন্ত এই রোগের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা বেশী থাকে।

ভাইরাস জনিত রোগ বিধায় এর জন্য ভ্যাকসিন বা টিকা প্রয়োগ করতে হবে। ভাইরাসজনিত রোগের জন্য সোনালি মুরগির ভ্যাকসিন সিডিউল মেনে চলতে হবে।

সোনালি মুরগির ভ্যাকসিন সিডিউল এর জন্য আমাদের এই লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন।

ফাউল পক্স

ফাউল পক্স একটি সংক্রামক রোগ যা ভাইরাসের সংক্রমনে হয়ে থাকে। সোনালি মুরগির যে কোন বয়সে পক্স হতে পারে কিন্তু বাচ্চা মুরগিতে হলে বেশি মারা যায়। সাধারণত শরীরের পালক বিহীন জায়গায় সাধারণত শক্ত গোটা উঠে এবং চোখ দিয়ে পানি পড়ে। এই রোগে মুরগির জ্বর শরীরে লেগেই থাকে।

যথাসময়ে টিকা প্রদান করতে হবে।

মারেক্স রোগ

এটি একপ্রকার ভাইরাস সৃষ্ট রোগ। এ রোগকে ফাউল প্যারালাইসিসও বলা হয়ে থাকে। সব বয়সের মুরগিতেই এ রোগ হতে পারে তবে প্রধানত ২-৫ মাসের বাড়ন্ত মুরগি এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। আক্রান্ত মুরগির বহিরাভাগের স্নায়ু এবং অনেক সময় গোনাড, বিভিন্ন ভিসেরাল অঙ্গ, ত্বক, চোখ, মাংস ইত্যাদিতে ও রোগের সৃষ্টি হয়।

মারেক্স রোগ প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন প্রদানই সর্বাপেক্ষা কার্যকর ব্যবস্থা।

সোনালি মুরগির প্রোটোজোইয়া জনিত রোগ

রক্ত আমাশয় বা ককসিডিওসিস

এটি একটি প্রোটোজোয়া জনিত রোগ। ২ মাস পর্যন্ত এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা বেশী। সারা বছরই এ রোগটি দেখা গেলেও তবে বর্ষাকালে এর প্রার্দুভাব বেশি দেখা যায়। রক্ত আমাশয় হলে সোনালি মুরগির ওজন সঠিক মাত্রায় আসে না। যা খামারিকে ব্যাপক লসের মুখে ফেলে দেয়।

টল্টাজুরিল বা এমপ্রোলিয়াম জাতীয় ওষুধ দিয়ে এই রোগ নিয়ন্ত্রন সম্ভব।

কৃমির সংক্রামন

সোনালি মুরগিতে কৃমির আক্রমন ঘটে। কৃমি হলে মুরগির ওজন কাংক্ষিত মাত্রায় আসে না। খাদ্যে অরুচী আসে। এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

সোনালিকে অবশ্যই কৃমির ওষুধ দেয়া উচিত।

সোনালি মুরগির ব্যাক্টেরিয়া জনিত রোগ

সালমোনেলোসিস বা পুলোরাম

সালমোনেলোসিস পোল্ট্রির ব্যাকটেরিয়া জনিত একটি রোগ।এটি পুলোরাম এবং ফাউল টাইফয়েড নামে পরিচিত। সালমোনেলা গ্যালিনেরাম ব্যাকটেরিয়ার কারনে এটি হয়ে থাকে। পুলোরাম রোগ বাচ্চা মুরগিতে এবং ফাউল টাইফয়েড পরিণত বয়সে দেখা দেয়।

খাদ্যে নিয়মিত সালমোনেলা কিলার বা নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় এন্টিবায়োটিক দেয়া যেতে পারে। তবে এর ভ্যাকসিন বা টিকা রয়েছে।

মাইকোপ্লাজমোসিস

মাইক্রোপ্লাজমোলেসিস বা ক্রনিক রেসপাইরেটরী ডিজিজ (সি আর ডি) একটি সংক্রামক রোগ। এটি শ্বাসতন্ত্রের একটি জটিল রোগ । সাধারণত শীত কালে এই রোগের প্রকোপ দেখা যায়। এটি মাইকোপ্লাজমা গ্যালিসেপ্টিকাম (Mycoplasma gallisepticum) নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা হয়ে থাকে। সব বয়সের মুরগীর হতে পারে, তবে ৪-১০ সপ্তাহের মুরগির এই রোগ বেশি হয়।

এই রোগ হলে সিপ্রোফ্লক্সাসিন জাতীয় ওষুধ দেয়া যেতে পারে।

ফাউল কলেরা

ফাউল কলেরা মুরগির একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত ছোয়াচে রোগ ।এই রোগে মৃত্যুর হার প্রায় ৩০-৫০% পযন্ত হতে পারে। এফাউল কলেরা (Pasteurella matocida) নামক ব্যাক্টেরিয়ার কারনে হয়ে থাকে। অতিরিক্ত গরম পড়লে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা বেশী হয়। এছাড়া পরিবেশে আদ্রতা বেশি থাকলে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

যেহেতু ব্যাক্টেরিয়াজনিত রোগ তাই যে কোন একটি ভালো এন্টিবায়োটিক দিতে হবে। তবে কলেরার ভ্যাকসিন বা টিকা রয়েছে।

ইনফেকশাস করাইজা

ইনফেকশাস করাইজা মুরগির শ্বাসতন্ত্রের একটি মারাত্মক রোগ। নাসারন্ধ্র প্রদাহ ও সাইনাস প্রদাহ ঘটিত উপসর্গ এ রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রদাহের ফলে নাসিকা থেকে পানির ন্যায় তরল পদার্থ নি:সৃত হয়।এ রোগে আক্রান্তের হার বেশি কিন্তু মৃত্যুর হার কম। হেমোফিলাস গ্যালেনেরাম নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ইনফেকশাস করাইজা সংক্রমিত হয়।

এই রোগের টিকা রয়েছে। সঠিক সময়ে টিকা প্রয়োগ করলে নিয়ন্ত্রন সম্ভব। এই রোগ হলে সিপ্রোফ্লক্সাসিন জাতীয় ওষুধ দেয়া যেতে পারে।

সোনালি মুরগি
ছবিঃ সোনালি মুরগি

এছাড়াও সোনালি মুরগির ক্ষেত্রে নীচের রোগ গুলিও দেখা যেতে পারে। ইনফেকশাস ব্রংকাইটিস, ইনফেকশাস ল্যারিংগোট্রাকিয়াটিস, ফ্যাটি লিভার সিনড্রম, ই-কলাই, লিভার লিউকোসিস।

সোনালি মুরগির রোগ ও চিকিৎসা নিয়ে আপনার মতামত আমাদের জানাতে পারেন।

আরো পড়তে পারেনঃ

ব্রয়লার মুরগির জাত

দেশি মুরগির ভ্যাকসিন সিডিউল

সোনালি মুরগির ভ্যাকসিন সিডিউল

হাঁসের ভ্যাকসিন সিডিউল

14 thoughts on “সোনালি মুরগির রোগ ও চিকিৎসা”

  1. সোনালী মুরগীর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কি ওষুধ খেতে দিতে হবে

    Reply
    • শ্বাসকষ্টের জন্য সাধারনত ডক্সাসাইক্লিন জাতীয় ঔষধ ব্যাবহার করা হয়। তবে মুরগির অনেক রোগের জন্যেই শ্বাসকষ্ট হতে পারে। চিকিতসকের পরামর্শ নিয়ে ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে।

      Reply
  2. কিছু মুরগির পায়ুপথের আশেপাশের লোম ওঠে যাচ্ছে এবং মাংস পেশী থেতলে রক্ত ঝড়ছে। ঠিক কোনো কোনো শিকারি প্রাণী কামড় দিলে যেমন হয়

    Reply
    • আপনার প্রশ্নটি পরিষ্কার নয়। আপনার মুরগিকে ভালো মানের প্রোবায়োটিক ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া যেতে পারে এবং দ্রুত উপজেলা ভেটেনারিয়ান ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

      Reply
      • amar sonali murgir bacca 1.5 month age..agula garer sathe matha choto kore bose jimay..hat diye dorle bomi kore dey…nake pani ace plz koronio ki??

        Reply
        • তীব্র ঠান্ডা লাগতে পারে। সাথে অন্যান্য রোগও দেখা যেতে পারে। ডাক্তারের পরামর্শে এন্টিবায়োটিক দিতে পারেন। তবে তারআগে রোগ কেন হলো সেটা খুঁজে সমাধান করতে হবে।

          Reply
  3. সদ্দি,গলা ঘড় ঘড়,খক খক কাশির জন্যে কি ওষুধ লাগবে?

    Reply
    • নিকটস্থ ভেটেনারির পরামর্শ নিন। সাধারনত এ জাতীয় রোগের জন্য সিপ্রোফ্লক্সাসিন ও ডক্সাসাইক্লিন জাতীয় এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। সাথে একটা কাশির সিরাপ যেমন, স্কয়ার ফার্মার রেস্পিরন ব্যবহার করা যেতে পারে। এন্টিবায়টিক ব্যবহারের পূর্বে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

      Reply
  4. ৪দিনের বাচ্চা কিন্তু পায়ে বল পাচ্ছে না। আর ঢুলে ঢুলে পড়ে যাচ্ছে। প্যারালাইষ্ট না। বাচ্ছা দুর্বল।এর সমাধান কি?

    Reply
    • থায়াবিন বা ভিটামিন বি (বি১,বি২,বি৬,বি১২) ও ক্যালসিয়াম দেয়ার পরামর্শ দেয়া যেতে পারে। নিকটস্থ ভেটেনারি ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

      Reply
  5. ৩/৪ মাস বয়স সোনালী মুরগীর । ঠান্ডা লাগছিলো, মাথা ফুলে গেছিলো । ওষুধ খাওয়ানোর পর ঠাণ্ডা কমে গেছে এবং মাথা ফোলা ও নাই। কিন্তু ঘন ঘন জর আসছে। ওষুধ খাওয়ানোর পর কিছু সময় জর থাকছে না, পরে আবার জর আসছে। প্রতিদিন রাতে জর আসে। কি করতে পারি?

    Reply
    • প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধ যেমন, ফাস্টভেট.৩ দিন বিকেলের পানিতে দিতে পারেন। এন্টিবায়োটিক ঔষধ প্রয়োগের পর ভিটামিন দেয়া ভালো। সকালের পানিতে যেকোন ভালো মানের ভিটামিন দিতে পারেন।

      Reply

Leave a Reply

%d bloggers like this: